1. admin@happinesstvbd.com : admin :
সোমবার, ২১ জুন ২০২১, ০৫:০৫ অপরাহ্ন

বর্ণবৈষম্য রোধে ইসলামের ভূমিকা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত : রবিবার, ২১ মার্চ, ২০২১
  • ৪০ জন দেখেছেন

বর্ণবৈষম্য মানবতা বিবর্জিতে এক ঘৃণ্য অপরাধ। ইসলামে বর্ণবাদের কোনো স্থান নেই। ইসলাম বরাবরই মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে সহাবস্থানের আহ্বান জানায়। বর্ণবৈষম্যের মূলে কুঠার আঘাত হেনে ইসলামই শান্তিপূর্ণ আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে বিশ্ববাসীর সামনে।

বর্ণবৈষম্য কী?
বর্ণবৈষম্য এমন দৃষ্টিভঙ্গি, চর্চা এবং ক্রিয়াকলাপকে বোঝায়, যেখানে বিশ্বাস করা হয় যে মানুষ বৈজ্ঞানিকভাবেই অনেকগুলো গোষ্ঠীতে (races) বিভক্ত এবং একই সাথে বিশ্বাস করা হয় কোনো কোনো গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীর চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যের জন্য উঁচু অথবা নিচু; কিংবা তার উপর কর্তৃত্ব করার অধিকারী; অথবা বেশি যোগ্য কিংবা অযোগ্য বলে বিবেচিত।

বর্ণবাদের উৎপত্তি
১৯৩০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকাতে প্রথম বর্ণবাদ শব্দের উৎপত্তি হয়। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত চলে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ ক্ষমতা দখল ও পেশী শক্তির প্রদর্শনী। শেতাঙ্গ শাসিত সরকার আইন করে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিবাসীদের কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ, দক্ষিণ এশীয়, বর্ণসংকর ইত্যাদি বর্ণে ভাগ করে। ফলে অধিকাংশ কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত জনপদ আফ্রিকায় সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী মূল ধারার সংখ্যাগরিষ্ঠের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে।

বর্ণবাদী এ আচরণে মানুষের গায়ের রঙেই বেশি চিহ্নিত হয় এ যুদ্ধ। বর্ণবৈষম্যের কারণেই সাদা-কালো মারা-মারি কিংবা জীবনহানির মতো নিকৃষ্ট ঘটনার জন্ম হয়। যুযে যুগে এ বর্ণবৈষম্যের কারণে প্রাণ দিতে হয়েছেন অনেককে।

বর্ণবাদ বিলোপে আন্দোলন
যার প্রেক্ষিতে ১৯৬৬ সালে তৈরি হয় একটি দিবস। যা আন্তর্জাতিক বর্ণবৈষম্য বিলোপ দিবস নামে পরিচিত। প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী এ দিবসটি পালিত হয়। এ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করা হয়।

তবে এ দিবসের প্রেক্ষাপট তৈরি হয় ১৯৬০ সালের ২১ মার্চ। সেদিন বর্ণবাদের পক্ষে আইন পাশের এক ষড়যন্ত্র হয়। সেখানে এ আইন পাসের বিরুদ্ধে হয় প্রতিবাদ। সে প্রতিবাদে মিছিলে পুলিশের গুলিতে ৬৯জন ব্যক্তি নিহত হয়।

অবশেষে জাতিসংঘ ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ২১ মার্চকে আন্তর্জাতিক বর্ণবৈষম্য বিলোপ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। তারপর থেকে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। বিশ্বের প্রায় দেশে এ বর্ণবৈষম্য বিলোপে নানা কর্মসূচি পালন করা হয়। বর্ণবাদী অনৈতিক আচরণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্য কাজ করে দেশগুলো।

ইসলামে বর্ণবাদের স্থান নেই
বর্ণবাদ নয়; সাদা-কালোর শান্তিময় সহাবস্থানের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ইসলাম। যেখানে সাদা আর কালো, নাগরিক আর সৈনিক, শাসক আর শাসিত তথা রাজা আর প্রজা সবই সমান। কুরআন ও সুন্নায় গোত্র প্রাধান্য ও বর্ণবাদিতাকে নিষেধ করা হয়েছে। বর্ণের ভিন্নতা, ভাষাগত বিভাজনকে মহান আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
‘আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও তোমাদের বর্ণের ভিন্নতা। নিশ্চয়ই এর মধ্যে নিদর্শনাবলি রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য।’ (সুরা রুম : আয়াত ২২)

কুরআন-সুন্নাহর বর্ণনা এবং ইসলামি খেলাফতের দায়িত্বশীল বণ্টনই এর অন্যতম উদারহরণ। ধর্ম বিশ্বাস, গাত্রবর্ণ, শক্তি ও বংশের অহঙ্কারবশত কোনো ব্যক্তি বা জাতি কর্তৃক নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করাকে ইসলাম কখনোই সমর্থন করেনি। কুরআনে এসেছে-
– ‘হে মানবমণ্ডলী! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের একজন নারী ও একজন পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি এবং বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হও। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত, যে সর্বাধিক পরহেজগার। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সব কিছুর খবর রাখেন। (সুরা হুজরাত : আয়াত ১৩)

– হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যয়ের সঙ্গে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে সদা দণ্ডায়মান হও। কোনো জাতির প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের কোনোভাবে প্ররোচিত না করে যে, তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ করো, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর; আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।’ (সুরা আল-মায়িদাহ : আয়াত ৮)

ইসলামের শুরু থেকে বর্ণবাদী আচরণের কোনো সুযোগই ছিল না। কে সাদা, কে কালোয়; ধনী কিংবা গরিবে আবার উঁচু-নিচু তারতম্য এবং শ্রেষ্ঠ-নিকৃষ্টের পার্থক্য করার কোনো সুযোগও দেয়নি ইসলাম। হাদিসে এসেছে-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের, কোনো আরবের ওপর কোনো অনারবের উচ্চ মর্যাদা নেই। একজন শ্বেতাঙ্গ একজন কৃষ্ণাঙ্গের তুলনায় এবং একজন কৃষ্ণাঙ্গ একজন শ্বেতাঙ্গের তুলনায় উচ্চতর নয়। পার্থক্য শুধু মানুষের চরিত্র ও কর্মের মাধ্যমে।’

বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্মান-মর্যাদা পাওয়া বর্ণবাদকে টানেননি বরং মর্যাদার মাপকাঠী কী হবে তা বলেছেন-
‘হে লোক সকল! তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহ তাআলার কাছে অধিকতর সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী; যে অধিক তাকওয়া অবলম্বন করে, সব বিষয়ে আল্লাহর কথা অধিক খেয়াল রাখে।’

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট করেছেন, ‘মানুষ দেখতে যতবেশি সুন্দরই হোক না কেন, তার মধ্যে যদি আল্লাহর ভয় না থাকে, উত্তম আমল না থাকে; কুরআন-সুন্নাহর আমল না থাকে তবে সে ব্যক্তি কখনোই শ্রেষ্ঠ হতে পারে না।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে মদিনা হিজরত করে প্রথমেই বংশ দ্বন্দ্বের অবসান করেছিলেন। ‘আউস ও খাজরাজ’-এর গোত্র দ্বন্দ্ব ছিল দীর্ঘ দিনের। এ গোত্রদ্বয়ের বিদ্যমান বিবাদ নিরসন করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন বিশ্বনবি।

মক্কা থেকে হিজরতকারী সাহাবি মুহাজির ও মদিনার স্থানীয় সাহাবী আনসারদের মধ্যে হৃদ্যতাপূর্ণ সুসম্পর্কই বলে দেয় ইসলাম কতবেশি উদার ও নৈতিকতার দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। আরও কিছু দৃষ্টান্ত-
– সুদূর পারস্যের ক্রীতদাস হজরত সালমান ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহু কে আহলে বাইতের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। হজরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু ঘোষণা করেন- ‘সালমান আমাদেরই ঘরের লোক।’

– হাবশি ক্রীতদাস বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু। ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন। এ কালো বর্ণের সাহাবিকে দেয়া হয়েছিল নেতার মর্যাদা। তার সম্পর্কে এক ঘটনা-
একবার বিশিষ্ট সাহাবি আবু জর গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহু তর্কের এক পর্যায়ে হজরত বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলে বসলেন- ‘কালো মায়ের সন্তান’। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা শুনে বিরক্ত হন। তিনি তখন আবু জর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, ‘তুমি এমন ব্যক্তি, যার মধ্যে এখনো জাহেলিয়াতের চিহ্ন রয়েছে।’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছোট্ট একটি মন্তব্যের কারণে হজরত আবু জর গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর বক্তব্যকে ‘জাহেলিয়াত’-এর সাথে তুলনা করেছেন।

শুধু তা-ই নয়, কৃষ্ণাঙ্গ কৃতদাস হজরত বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু মদিনায় হিজরতের পর মসজিদে নববিতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে নামাজের আজান দেয়ার জন্য মুয়াজ্জিন হিসেবে নিযুক্ত করেন।

– হজরত উসামাহ ইবনু জায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু। পারস্যের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য প্রধান সেনাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। অথচ তখনও হজরত আবু বকর, ওমর ও আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুম-এর মতো প্রসিদ্ধ সাহাবিরা জীবিত ছিলেন।

এসব সাহাবিদের দ্বিধাহীন নেতৃত্ব ও আনুগত্য মেনে নিয়েছিলেন উচ্চ বংশ মর্যাদা ও নেতৃস্থানীয় সাহাবায়ে কেরাম। প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেছিলেন-
‘কিশমিশ আকারের মস্তিষ্ক বিশিষ্ট কোনো হাবশি গোলামকেও যদি তোমাদের নেতা নিযুক্ত করা হয়, তবুও তোমরা তার কথা শুনবে এবং পূর্ণ আনুগত্য করবে।’ (বুখারি)

দুঃখ ও পরিতাপের বিষয়
আধুনিকতার এ সময়ে বর্ণবাদ একটি অন্যতম সমস্যা। এ বৈষম্য ও বর্ণবাদ দূরীকরণের ব্যাপারে জোর প্রচেষ্টা চালানো সত্ত্বেও বিশ্ব থেকে এখনো বৈষম্য ও বর্ণবাদের অবসান হয়নি। এমনকি এই বর্ণবাদের কারণেই বিশ্বব্যাপী এখনও অনেক মানুষকে প্রাণ হারাতে হচ্ছে।

পরিশেষে…
বিশ্ববাসীকে আজ এমন এক সমঝোতায় আসতে হবে, যাতে বর্ণবাদদের মতো কোনো ঘৃণ্য মতবাদ অস্তিত্ব না থাকে। যেন পৃথিবীজুড়ে ঘোষিত হয় মক্কা বিজয়ের ঐতিহাসিক সে ঘোষণা-
‘জেনে রাখ! গর্ব অহঙ্কার গৌরব ও আভিজাত্যবোধ প্রভৃতির সব সম্পদ এবং রক্ত ও সম্পত্তি সম্পর্কিত যাবতীয় অভিযোগ আজ আমার এই দুই পদতলে নিপিষ্ট। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জাহেলি যুগের সব হিংসাবিদ্বেষ ও গর্ব অহঙ্কার এবং পৈতৃক গৌরব ও শ্রেষ্ঠত্ববোধ নির্মূল করে দিয়েছেন। হয়তো বা সে মুমিন-মুত্তাকি অথবা অন্যায়কারী দুর্ভাগা হবে। সব মানুষ আদম থেকে উৎসারিত। আর আদম মাটি থেকে।’

অতএব এ কথা সুস্পষ্ট যে, ইসলামে প্রত্যেকের সমান অধিকার সুনিশ্চিত। ইসলামের কোনো বিধানই বর্ণবাদের পক্ষে নয়। গোত্রতন্ত্র ও বর্ণবাদ নির্মূলে বিশ্বব্যাপী ইসলাম অনুপম আদর্শ ও নির্দেশিত বিধান অনুসরণই যথেষ্ট।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে সাদা-কালো, ধনী-গরিব, উঁচু-নিচুর ভেদাভেদ ভুলে ইসলামের সুমহান ছায়াতলে অবস্থান করে কুরআন-সুন্নাহ নির্দেশিত শান্তিপূর্ণ সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে নিজেদের নিয়োজিত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটেগরীর আরো নিউজ
© All rights reserved © 2019-happinesstvbd.com
Develper By : Porosh Network Ltd